এলোমেলো কথা
এই ব্লগটা খুলেছি নিজের মনের কথা লিখতে। গত কয়েক মাস যাবৎ আমার মন খুব অস্থির হয়ে আছে। আব্বু মারা যাবার পর থেকে আমার পৃথিবী একদম অন্ধকার হয়ে গেছে। আমার ধারণা আমার মাথায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যদিও বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। দিব্যি খাচ্ছি-যাচ্ছি, শাড়ি পরে বেড়াতে যাচ্ছি। কিন্তু কোন কাজ করতে পারছি না। মন লাগিয়ে ভেবে কিছু করতে হলে পারছি না। অফিসের কোন কাজ ঠিকমতন করতে পারছি না। কেউ বুঝতে পারছে না, পারার কথাও না। মধ্যবিত্তের এই সমস্যা। পেটভরা আবেগ, কিন্তু আবেগ দেখানোর কোন সুযোগ নাই।
আমার স্বামী আমাকে বলে আমি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নায়িকা। অস্বীকার করবো না, আমি একদম সেরকমই আবেগী এবং খেয়ালী। বেঁচে থাকবো দুই দিন, নিজের পৃথিবী যদি উপভোগ না করলাম তাহলে জীবনের মূল্য কি! যাই হোক, যা বলছিলাম সেই কথায় ফেরত যাই। গতকাল আম্মুর ওখানে গেলাম। আমার ভাই আমাকে বললো, আপু তোমার মন খারাপ কেন? আমি একটু চিন্তা করলাম। আমার মন কেন খারাপ। কোন নির্দিষ্ট কারণ নাই কিন্তু। শুধু মন খারাপ। একজায়গায় বসি তো বসে থাকি, রাতে ঘুমাই না, তাকিয়ে থাকি। এরপর একসময় ঘুম আসে। সকালে দেরি করে জাগি এবং দেরি করে অফিস যাই। এই মন খারাপের কোন কারণ নাই। আবার কারণ আছেও। আমার আব্বু মারা গেছে আজকে ৬০ দিন হয়েছে। তাই আমার সবসময়ই মন খারাপ থাকে। বাংলাদেশের আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতন আমার পরিবারেও হাসি ছিল, কান্না ছিল। আর দশটা মধ্যবিত্ত বাবার মতনই আমার আব্বু নিজের ভালোবাসা দেখতে পারতেন না। সন্তানদের কোন অর্জনে তাদের বাহবা দিতে পারতেন না আবার তাদের কোন কষ্টে সান্তনা দিতে কি বলবেন তাও বুঝতেন না। হয়তোবা বুঝতেন, কিন্তু সংকোচ ছিল প্রচণ্ড। ভালোবাসা আর সংকোচের মাঝে সবসময় সংকোচই জিতে যেত। এই সংকোচ অবশ্য কেটে গেল যেদিন আব্বুকে আইসিউতে নেয়া হলো সেদিন। আব্বুর প্রতি আমার অনেক রাগ ছিল, ক্ষোভ ছিল। সেসবের অনেক কিছুই চলে গেছে আমার বিয়ের পরে, সব রাগ, ক্ষোভ চলে গেছে আব্বু কোভিড হয়ে আইসিইউতে যাওয়ার পরে। বিশাল ভেন্টিলেটরের মাস্ক লাগিয়ে আব্বুকে একদম শিশুর মতন লাগছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো আমি আব্বুর মা আর আব্বু আমার সন্তান। হাসপাতালের আইসিইউতে সাধারণত রোগীর সাথে কাউকে থাকতে দেয় না, পিজিতে দিলো। তাও আবার কোভিড ইউনিটে। আমি, আমার ভাই আর আম্মু পালা করে থাকি। সবসময়ই দুইজন করে থাকি। আব্বুকে সকল ভালোবাসার কথা বলার চেষ্টা করলাম আমি, আম্মু। আমার ভাই আব্বুর মতন লাজুক, তার সংকোচ বেশি। সে মোটিভেটিং কথাবার্তা বলে আব্বুকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলো। আব্বুও অনেক চেষ্টা করলো।
কিন্তু কোন চেষ্টাই কাজের লাগলো না। আব্বু আইসিইউতে ভর্তির ঠিক ৩০ দিনের মাথায় মারা গেলো। আব্বুর মৃত্যুর সময় আমি, আমার ভাই, আমার স্বামী আর আমার ছোট মামা পাশে ছিলাম। আম্মু আর আমার বোনরা তার কিছুক্ষন আগেই বের হয়েছে হাসপাতাল থেকে। ওরা আবার আসলো। পরম ভালোবাসায় আমরা সবাই আমার আব্বুকে ধরে রাখলাম, দোয়া-দরূদ এবং কলেমা পড়তে থাকলাম। আব্বু আমাদেরকে একা রেখে আল্লাহর কাছে চলে গেলো। আমার পুরো পৃথিবী একদম বদলে গেলো, একেবারের জন্যে, আমার পরিবারের সবার পৃথিবীই বদলে গেলো। আমার আব্বু পৃথিবীর অনেক কিছু না দেখে চলে গেছেন, আবার অনেক কিছু দেখেও গেছেন। আব্বুকে নিয়ে আলাদা করে কোন চিন্তা আমার ছিলো না। আব্বু গম্ভীর নানা হবেন, এটা নিয়ে আমরা ভাইবোনরা মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা করতাম। এটা আর আমার দেখা হলো না। কত সাধারণ স্বপ্ন, কত সাধারণ কথা। কিন্তু কি কষ্টকর অতৃপ্তি। কি অসম্ভব ভালোবাসা যে লুকিয়ে ছিল আমাদের মাঝে, সেটা আমরা কখনোই জানতাম না। এখন জানলাম, আব্বু চলে যাবার পরে। এই কষ্টটা আমার কখনোই যাবে না, আমি শুধু কষ্টটা নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখবো। কেউ বুঝবে না যে কিরকম কষ্ট নিয়ে আমি চলছি, ফিরছি। এই কথা অবশ্য ঠিক না। আমার ভাই বোনরা বুঝবে, আম্মু বুঝবে।
কি কি যে লিখলাম। কেউ পড়লে কি মনে করবে জানি না। মনে করলে কি আর করা, আমার কষ্টটা তো আর কমবে না। আমার মতন অনেকেই এই কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছেন, অনেকেই যাবেন। সৃষ্টিকর্তা সবাইকে এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা দিক।
Comments
Post a Comment